অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে-সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য অধিকার এবং রাজস্ব ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অন্যতম। এসব বিষয় নিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরুর এক মাসের আগেই রাজপথে নেমেছে বিরোধী দল। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে আবারও কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, বিষয়টি রাজপথে চলে গেলে তা আর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এটি কারও কাম্য নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, অধ্যাদেশগুলো নিয়ে সরকারি দল বিএনপি একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু ওই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করেনি। এর ফলে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপিত না হয়ে তামাদি হয়ে যাবে। এর সারকথা হলো-সংস্কার আর হচ্ছে না। অর্থাৎ সংস্কারের বিষয়ে আমরা ‘স্কয়ার জিরোতে’ চলে গেলাম। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, ১৮ মাস ধরে যে প্রস্তুতি নেওয়া হলো, তা আর বাস্তবায়ন হলো না। তার মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটা রেজিম (ক্ষমতা) পরিবর্তন হলো মাত্র। এটুকুই অর্জন। জনগণের প্রত্যাশা অনুসারে রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং আইনকানুনের সংস্কার খুব একটা হলো না। আলতাফ পারভেজ বলেন, অধ্যাদেশগুলো বাতিলের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া গেল, বিএনপি মৌলিক সংস্কারে আর রাজি হবে না। অর্থাৎ তারা সংস্কার করবে না। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের থেকে বেরিয়ে আসতে যে সংস্কার প্রয়োজন, তা আর হলো না। আমরা আবার ২০২৪ সালেই ফেরত গেলাম। মাঝখানে দুটি বছর নিষ্ফল চলে গেল।
জানতে চাইলে অধ্যাদেশ মূল্যায়নে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রধান ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন সংসদ সার্বভৌম। সংসদের সদস্যরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। ফলে তারা চাইলে কোনো অধ্যাদেশ রাখতে পারেন, আবার বাতিলও করতে পারেন। তবে আমরা কোনোটিই বাতিল করিনি। কিছু অধ্যাদেশ ল্যাপস (অকার্যকর) হয়ে যাবে। এগুলো আবার বিল আকারে উত্থাপিত হবে। এই অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপ না দেওয়ায় সংস্কার নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিনা জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা আসছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিচারক নিয়োগের যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সেখানে আইনজীবীদের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনসহ বেশ কিছু জায়গায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধি নেই। আরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। ফলে কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। দুর্বলতাগুলো সংশোধন করে পরবর্তীতে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ না থাকলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংসদ কার্যকর হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ আইনে রূপ দিতে হয়। সেই আইনে রূপ দেওয়া সম্ভব না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। রাষ্ট্র সংস্কারে গত দেড় বছরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে বিল আকারে পাশ না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ মূল্যায়নে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৩ সদস্যের এ বিশেষ কমিটির ১০ জনই বিএনপির এবং বাকি তিনজন জামায়াতের ইসলামীর সংসদ-সদস্য। কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। কমিটি ১ এপ্রিল সুপারিশ জমা দিয়েছে। এতে ১৩৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করতে বলা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে। বাকি ২০টির মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া যে ১৫টি অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হচ্ছে, এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশও রয়েছে। তবে যেসব অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন করা হচ্ছে, তার সবগুলোতেই নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতের তিন সদস্য।

