‘মঙ্গল’ নাম থেকে ‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’ নামে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলছে, যেখানে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একে অপরের পরিপূরক হবে।
বাংলার মুসলিম সংস্কৃতিতেও শোভাযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের ‘তাজিয়া মিছিল’ বা মহররমের শোভাযাত্রা ছিল অত্যন্ত জাঁকালো। ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের তাজিয়া মিছিলে অশ্ব, বিশাল পতাকা এবং বাঁশের তৈরি স্থাপত্যশৈলী প্রদর্শিত হতো। এছাড়া মধ্যযুগীয় বাংলার বিবাহ অনুষ্ঠানে বরপক্ষের হাতি বা ঘোড়ায় চড়ে বাদ্যযন্ত্রসহ শোভাযাত্রা করে কনের বাড়ি যাওয়ার রেওয়াজ ছিল একটি সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। এই সমস্ত ধারাগুলো মিলেমিশেই বাংলার একটি ‘শোভাযাত্রা কেন্দ্রিক’ মনন তৈরি হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখের আধুনিক উদযাপনের মূলে রয়েছে মোগল সম্রাট আকবরের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি ও সৌর সনের সমন্বয় করে যে ‘ফসলি সন’ প্রবর্তিত হয়, তাই আজকের ‘বঙ্গাব্দ’। কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করত এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারদের বাড়ি ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানে আপ্যায়িত হতো। অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে গ্রাম বাংলায় যে মেলা বসত, তাই ছিল বাঙালির সর্বজনীন উৎসবের আদি রূপ। মেলায় গ্রামীণ শিল্পীরা তাদের হাতের তৈরি তৈজসপত্র, কাঠের খেলনা ও মৃৎশিল্প নিয়ে আসত, যা আধুনিক শোভাযাত্রার মোটিফ গঠনে সাহায্য করেছে।
আধুনিক নববর্ষের শোভাযাত্রা মূলত একটি শৈল্পিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ফসল। এটি কেবল উৎসব নয়, বরং ছিল একটি ‘নীরব প্রতিবাদ’। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে প্রথম সম্মিলিত শোভাযাত্রা বের হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি শোষণের স্মৃতি মুছে বাঙালির নিজস্বতা পুনরুদ্ধার। ১৯৮৫ সালে যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘চারুপীঠ’-এর উদ্যোগে শিল্পী মাহবুব জামাল শামিম ও তরুণ ঘোষের নেতৃত্বে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের হয়। কিংবদন্তি শিল্পী এস এম সুলতান ছিলেন এই আয়োজনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা যশোরের সেই মডেল অনুসরণ করে ঢাকায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র সূচনা করেন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত উত্তাল—একদিকে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের শাসন, অন্যদিকে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার রেশ। মানুষ যখন হতাশাগ্রস্ত, তখন শিল্পীরা হাতি, ঘোড়া ও বিশালাকার বাঘের প্রতিকৃতি নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন। রাজনৈতিক স্লোগানের বদলে তারা ‘শিল্পের শক্তি’ দিয়ে প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করেন।
শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্রতিটি প্রতীক বা মোটিফের একটি সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থ রয়েছে। যেমন হাতি ঐশ্বর্য ও জাতীয় শক্তির প্রতীক, বাঘ শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক, পেঁচা প্রজ্ঞা ও পাহারাদারের প্রতীক এবং টেপা পুতুল সারল্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। তবে ১৯৯০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে বিশেষ করে শোভাযাত্রাটি যখন ‘মঙ্গল’ নাম ধারণ করে, তখন থেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে যোজন যোজন মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়। ইসলামি সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে মঙ্গল ও অমঙ্গলের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ; ফলে ‘মঙ্গল’ কামনায় কোনো প্রাণীর প্রতিকৃতির পেছনে হাঁটা অনেকের কাছে ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী মনে হতে পারে। এছাড়া পেঁচা, হাঁস বা বাঘের মতো প্রতীকের সাথে হিন্দু দেব-দেবীর বাহনের সাদৃশ্য থাকায় অনেকে একে একটি বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতির আরোপ হিসেবে দেখেন।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তার ‘ইনভেনশন অফ ট্র্যাডিশন’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, অনেক সময় রাষ্ট্র বা বিশেষ এলিট গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক আদর্শিক প্রয়োজনে নতুন কিছু আচারকে ‘প্রাচীন ঐতিহ্য’ হিসেবে চালিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানী আন্তোনিও গ্রামসির মতে, এটি সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল হতে পারে, যা অনেক সময় বৃহত্তর জনমানুষের ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করে সাংস্কৃতিক মেরুকরণ তৈরি করে।
বর্তমানে এই শোভাযাত্রার প্রভাব কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি প্রবাসীরা সিডনি থেকে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক থেকে টরন্টো—সবখানেই বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন করছেন। এটি এখন বৈশ্বিক বাঙালির জন্য একটি ‘সাংস্কৃতিক নোঙর’ হিসেবে কাজ করছে। তবে এই বিশ্বায়নের যুগে উৎসবটি এক ধরনের বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছে। বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা উৎসবের আদি ও অকৃত্রিম লোকজ আবেদনকে অনেক সময় ম্লান করে দিচ্ছে। প্লাস্টিক বা কৃত্রিম উপকরণের ব্যবহার গ্রামীণ মৃৎশিল্পীদের জীবিকাকে সংকটে ফেলছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি উৎসবের ‘পণ্যায়ন’ (Commodification), যা এর প্রতিরোধের ভাষাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে নববর্ষের উৎসবেও। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং অন্তর্বর্তী সরকার একে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘মঙ্গল’ শব্দের ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা এবং একে ঘিরে চলমান তীব্র সামাজিক বিতর্ক নিরসন করে উৎসবকে পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত ও সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই নামকরণ। ২০২৫ সালের শোভাযাত্রায় সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি এবং স্বৈরাচারবিরোধী প্রতীকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এছাড়া পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণের ফলে এটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই শোভাযাত্রার টিকে থাকা নির্ভর করবে এর অভিযোজন ক্ষমতার ওপর। এটি যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতীকী প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, তবে তা সর্বজনীনতা হারাবে। কিন্তু যদি এটি সব ধর্ম, বর্ণ ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার এবং আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে, তবেই এর নান্দনিকতা সার্থক হবে। বাঙালির এক হাজার বছরের শোভাযাত্রার ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সংস্কৃতি সবসময়ই প্রবহমান এবং পরিবর্তনশীল। পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের উৎসব হলেও এর উদযাপন পদ্ধতি যেন কোনো বিভেদ তৈরি না করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। ‘মঙ্গল’ নাম থেকে ‘আনন্দ’ বা ‘বৈশাখী’ নামে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলছে, যেখানে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একে অপরের পরিপূরক হবে। তিমির বিনাশী এই শৈল্পিক পদযাত্রাই হোক আমাদের আগামী দিনের নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের মূল ভিত্তি


